ইরান: অনুভূতির বদলে যাওয়া স্রোত
বিরোধী-আমেরিকান মনোভাবের ম্লান ছায়া
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। একসময় যে জাতি বিরোধী-আমেরিকান মনোভাবে নিজেকে চিহ্নিত করত, সেখানে এখন তরুণ সমাজ তাদের সাবেক শত্রুকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছে। এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে শাসক শ্রেণীর প্রতি হতাশা এবং একই সঙ্গে আমেরিকান সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ।
নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিকোণ
তরুণ ইরানীয়দের কাছে তাদের পিতৃপুরুষের বিরোধী-আমেরিকান আবেগ খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়। ১৯৭৯-এর বিপ্লবের পর জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম দুই দেশের মধ্যেকার শত্রুতার ইতিহাস সরাসরি প্রত্যক্ষ করে নি; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বমাধ্যমের প্রবেশাধিকারই তাদের বিশ্বদৃষ্টি গঠন করেছে।
শাসনব্যবস্থার প্রতি হতাশা
সরকারের অব্যবস্থাপনা, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব ইরানী রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয় করেছে। তরুণরা নেতাদের ব্যর্থতা স্পষ্ট দেখতে পায় এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষী। তারা বুঝতে পারে, বিরোধী-আমেরিকান বক্তব্যকে সহজ অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে শাসকগোষ্ঠীর নিজস্ব ত্রুটি ঢাকতে।
আমেরিকান সংস্কৃতির গ্রহণ
পশ্চিমা প্রভাব দমনের সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ব্লগ, বেসরকারি পার্টি, চলচ্চিত্র ও পড়াশোনার মাধ্যমে আমেরিকান সংস্কৃতি ইরানী সমাজে ঢুকে পড়েছে। তরুণ ইরানীয়রা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক সুযোগের আমেরিকান মূল্যবোধে আকৃষ্ট হচ্ছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ
ইরানী বুদ্ধিজীবীরাও আবার আমেরিকান লেখক ও চিন্তার দিকে ঝুঁকছেন। ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ, স্বতন্ত্র বিচারব্যবস্থা ও শক্তিশালী প্রেসিডেন্সির পক্ষে লেখা তাদের অনুপ্রাণিত করছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক জটিল ও প্রায়ই উত্তেজনাপূর্ণ। তবে সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সময়ও ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে আমেরিকান মিশনারিরা ইরানের সাংবিধানিক বিপ্লবে গণতান্ত্রিক নীতির পক্ষে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।
পারমাণবিক ইস্যু ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
তরুণ সমাজের কাছে আমেরিকার প্রতি উষ্ণ অনুভূতি সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা বহাল আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ধারণা, ইরান অস্ত্র তৈরির পথে; ইরান বলছে, কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই। সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এখনও টানা।
সংস্কার ও প্রতিরোধ
ইরানে সংস্কার আন্দোলন গড়ে উঠেছে, যা বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও উন্মুক্ত সমাজের পক্ষে। কিন্তু সরকারের কট্টরপন্থি অংশ এই চেষ্টায় বাধা দিচ্ছে। সংস্কারক ও কট্টরপন্থিদের টানাটানির ফলই নির্ধারণ করবে ইরানের ভবিষ্যৎ।
জাতীয় গর্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
শাসনব্যবস্থার সমালোচনা সত্ত্বেও তরুণ ইরানীয়রা দারুণ দেশপ্রেমী। তারা নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত। এই জাতীয় গর্ব ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা—দুই মিলিয়ে ইরানের নেতাদের জন্য জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ভবিষ্যৎ পথ
ইরান এখন মোড়ে দাঁড়িয়ে। ইসলামি বিপ্লবকে হয় সংস্কারের পথ ধরে এগোতে হবে, নয়তো তরুণ প্রজন্মের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। এই সংগ্রামের ফল ইরানের ভবিষ্যৎ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।
